ঢাকা , রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
নওগাঁর রানীনগরে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে তিন দস্যু গ্রেপ্তার, উদ্ধার মোটরসাইকেল-ছুরি-মোবাইল মাদক, বাল্যবিবাহ ও সাইবার ক্রাইম রুখতে ছাত্রীদের সচেতন হওয়ার আহ্বান নওগাঁর পুলিশ সুপারের শহরে এআই নজরদারি, অপরাধ দমনে নতুন উদ্যোগ,স্মার্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থার পথে নওগাঁ নওগাঁয় জমি দখলের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও নিরাপত্তা দাবি নওগাঁয় আত্মহত্যা বলে চালানো হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচন, স্বামীর স্বীকারোক্তি ধামইরহাটের তরুণীর অশ্লীল ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে টাঙ্গাইলে যুবক গ্রেপ্তার নওগাঁয় মধ্যরাতে পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান, ৯০ কেজি গাঁজাসহ আটক ২ জমি নিয়ে বিরোধে মান্দায় বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, আটক ৪ প্রথমবারের মতো ভর্তি কার্যক্রম শুরু করছে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ ও জনগণের যৌথ তৎপরতা: নওগাঁয় ধারালো চা’কুসহ ২ ছিনতাইকারী গ্রেফতার, রিকশা ও লুণ্ঠিত মালামাল জব্দ
নোটিশ :
সারাদেশে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে, আগ্রহীরা আজই যোগাযোগ করুন ০১৭১১৭২৯২২৪

নওগাঁয় সমাজ সেবা বিভাগে ভুয়া কার্ডের ছড়াছড়ি

নওগাঁর মহাদেবপুরে সমাজসেবা বিভাগের মাধ্যমে বিভিন্ন ভাতা বিতরণে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভাতাভোগীদের কার্ড করে দেয়ার নাম করে টাকা নেয়া, যারা ভাতা পাবার যোগ্য নয় তাদেরকেও কার্ড করে দেয়া এখন ওপেন সিক্রেট। ফলে প্রতিবছর অযোগ্যরা কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করে নিয়ে যাচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছেন দু:স্থরা। নতুন করে আলোচনায় এসেছে কম্পিউটার থেকে বের করে দেয়া অসংখ্য ভূয়া কার্ড। সংশ্লিষ্ট অফিসের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজসে এসব ভূয়া কার্ড তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। এজন্য তারা বিভিন্ন ইউনিয়নের মেম্বার, চৌকিদার, নারী নেত্রী ও নেতাদেরকে ব্যবহার করছেন। তারা অফিসের নাম করে টাকা নিয়ে এসব ভূয়া কার্ড তৈরি করে দিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে যে, টাকা দিলেই মিলছে প্রতিবন্ধী কার্ড। যারা আদৌ প্রতিবন্ধী নন, বরং সব দিক থেকে একদম সুস্থ্য সবল মানুষ তাদের নামেও প্রতিবন্ধী কার্ড ইস্যু করা হয়েছে। প্রতি তিন মাস অন্তর তাদের নামে টাকাও আসছে।

উপজেলার উত্তরগ্রাম ইউনিয়নের উত্তরগ্রাম গড়ের পাড় গ্রামের মৃত আশরাফুল ইসলামের ছেলে আবু বক্কর ছিদ্দীক (৫১) অভিযোগ করেন যে, তিনি পায়ের সমস্যায় কোন কায়িক পরিশ্রম করতে পারেন না। এজন্য তিনি দুবছর আগে তার ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যের কাছে যান। ওই ইউপি সদস্য উপজেলা সমাজসেবা অফিসে নিয়ে গিয়ে ফরম পূরণ করে দেন। সেই থেকে তিনি তার প্রতিবন্ধী কার্ডের জন্য বার বার অফিসে ও ইউপি সদস্যের কাছে ধর্ণা দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে অফিস থেকে তার হাতে একটি কার্ড ধরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু তার নামে কোন টাকা আসেনি। পরে সমাজসেবা কর্মকর্তার নিকট কার্ডটি দেখালে সেটি নকল বলে জানান ওই কর্মকর্তা। ওইগ্রামের বাক প্রতিবন্ধী আজাদুল ইসলামের স্ত্রী রুমি খাতুন অভিযোগ করেন যে, তিনি তার প্রতিবন্ধী ছেলে আমান শুভ (১২) এর একটি ভাতার কার্ড করার জন্য তার ওয়ার্ডের মহিলা মেম্বারের স্বামীর কাছে যান। তিনি অফিসে কাগজপত্র দিয়ে একটি কার্ড করে দেন। কিন্তু দীর্ঘ দিনেও তার নামে কোন টাকা না আসায় সম্প্রতি উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কাছে যান। তিনি কার্ডটি দেখেই জানিয়ে দেন যে সেটি নকল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি তিন মাস অন্তর প্রতিবন্ধীদের নামে ভাতা বিতরণের সময় দেখা যায়, অসংখ্য নারী-পুরুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ভাতা নিচ্ছেন যারা একটুও প্রতিবন্ধী নন, আবার দু:স্থও নন। বরং সুস্থ্য সবল, আর স্বচ্ছল। অভিযোগকারীরা বলছেন, উত্তরগ্রাম ইউপি মেম্বার জাহাঙ্গীর আলম, মহিলা মেম্বারের স্বামী রবিউল ইসলাম, রাজনৈতিক নেতা ময়েন উদ্দিন প্রমুখ অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এসব কার্ড করার তদবির করেন। সম্প্রতি খাজুর ইউপি সদস্য আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে, প্রতিটি চার হাজার টাকার বিনিময়ে প্রায় চারশ’ প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দেন যারা আদৌ প্রতিবন্ধী নন। লক্ষ্মণপুর গ্রামের অর্ধশতাধিক প্রতিবন্ধী ভাতাভোগী যারা প্রতিবন্ধী নন, তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওইগ্রামের কথিত নেতা রহমান টাকার বিনিময়ে তাদের প্রতিবন্ধী কার্ড করে দেন।

তবে অভিযুক্ত সকলের সাথে মোবাইলফোনে কথা বললে, তারা কোনরকম অনৈতিক সুবিধা নেয়ার কথা অস্বীকার করেন। তারা ভূয়া কার্ড করে দেননি বলেও দাবি করেন।

জানতে চাইলে, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা অপকটে স্বীকার করেন ভূয়া কার্ডের কথা। তিনি বলেন, “বর্তমানে এই উপজেলায় প্রতিবন্ধী, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা, অনগ্রসর জনগোষ্ঠী প্রভৃতির মোট ৪১ হাজার কার্ডধারী ভাতাভোগী রয়েছে। এরমধ্যে প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর কার্ড রয়েছে ১৯ হাজার। এছাড়া আরো অন্তত ছয় হাজার কার্ড রয়েছে নকল বা ভূয়া, যেগুলো সরকারি অনুমোদন ছাড়াই কম্পিউটার দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।”

ওই কর্মকর্তা বলেন যে, তিনি এই উপজেলায় যোগদানের পর বিষয়গুলো যাচাই বাছাই করে গত অর্থবছরে তিন হাজার ৩৯৩টি ভূয়া প্রতিবন্ধী কার্ড বাতিল করেছেন। তার মতে এখনও ১৯ হাজার বৈধ কার্ডের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই প্রতিবন্ধী নন। এসব আরো যাচাই বাছাই করে বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান।

তিনি স্বীকার করেন যে, সুস্থ্য মানুষের নামে প্রতিবন্ধী কার্ড ইস্যু ও ভূয়া কার্ড তৈরিতে তার অফিসের দুজন কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। এদের একজনকে অন্যত্র বদলী করা হয়েছে, আর একজন অবসর প্রস্তুতি পিএলআর এ রয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নওগাঁর রানীনগরে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে তিন দস্যু গ্রেপ্তার, উদ্ধার মোটরসাইকেল-ছুরি-মোবাইল

নওগাঁয় সমাজ সেবা বিভাগে ভুয়া কার্ডের ছড়াছড়ি

আপডেট সময় ০২:৪৬:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

নওগাঁর মহাদেবপুরে সমাজসেবা বিভাগের মাধ্যমে বিভিন্ন ভাতা বিতরণে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভাতাভোগীদের কার্ড করে দেয়ার নাম করে টাকা নেয়া, যারা ভাতা পাবার যোগ্য নয় তাদেরকেও কার্ড করে দেয়া এখন ওপেন সিক্রেট। ফলে প্রতিবছর অযোগ্যরা কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করে নিয়ে যাচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছেন দু:স্থরা। নতুন করে আলোচনায় এসেছে কম্পিউটার থেকে বের করে দেয়া অসংখ্য ভূয়া কার্ড। সংশ্লিষ্ট অফিসের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজসে এসব ভূয়া কার্ড তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। এজন্য তারা বিভিন্ন ইউনিয়নের মেম্বার, চৌকিদার, নারী নেত্রী ও নেতাদেরকে ব্যবহার করছেন। তারা অফিসের নাম করে টাকা নিয়ে এসব ভূয়া কার্ড তৈরি করে দিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে যে, টাকা দিলেই মিলছে প্রতিবন্ধী কার্ড। যারা আদৌ প্রতিবন্ধী নন, বরং সব দিক থেকে একদম সুস্থ্য সবল মানুষ তাদের নামেও প্রতিবন্ধী কার্ড ইস্যু করা হয়েছে। প্রতি তিন মাস অন্তর তাদের নামে টাকাও আসছে।

উপজেলার উত্তরগ্রাম ইউনিয়নের উত্তরগ্রাম গড়ের পাড় গ্রামের মৃত আশরাফুল ইসলামের ছেলে আবু বক্কর ছিদ্দীক (৫১) অভিযোগ করেন যে, তিনি পায়ের সমস্যায় কোন কায়িক পরিশ্রম করতে পারেন না। এজন্য তিনি দুবছর আগে তার ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যের কাছে যান। ওই ইউপি সদস্য উপজেলা সমাজসেবা অফিসে নিয়ে গিয়ে ফরম পূরণ করে দেন। সেই থেকে তিনি তার প্রতিবন্ধী কার্ডের জন্য বার বার অফিসে ও ইউপি সদস্যের কাছে ধর্ণা দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে অফিস থেকে তার হাতে একটি কার্ড ধরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু তার নামে কোন টাকা আসেনি। পরে সমাজসেবা কর্মকর্তার নিকট কার্ডটি দেখালে সেটি নকল বলে জানান ওই কর্মকর্তা। ওইগ্রামের বাক প্রতিবন্ধী আজাদুল ইসলামের স্ত্রী রুমি খাতুন অভিযোগ করেন যে, তিনি তার প্রতিবন্ধী ছেলে আমান শুভ (১২) এর একটি ভাতার কার্ড করার জন্য তার ওয়ার্ডের মহিলা মেম্বারের স্বামীর কাছে যান। তিনি অফিসে কাগজপত্র দিয়ে একটি কার্ড করে দেন। কিন্তু দীর্ঘ দিনেও তার নামে কোন টাকা না আসায় সম্প্রতি উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কাছে যান। তিনি কার্ডটি দেখেই জানিয়ে দেন যে সেটি নকল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি তিন মাস অন্তর প্রতিবন্ধীদের নামে ভাতা বিতরণের সময় দেখা যায়, অসংখ্য নারী-পুরুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ভাতা নিচ্ছেন যারা একটুও প্রতিবন্ধী নন, আবার দু:স্থও নন। বরং সুস্থ্য সবল, আর স্বচ্ছল। অভিযোগকারীরা বলছেন, উত্তরগ্রাম ইউপি মেম্বার জাহাঙ্গীর আলম, মহিলা মেম্বারের স্বামী রবিউল ইসলাম, রাজনৈতিক নেতা ময়েন উদ্দিন প্রমুখ অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এসব কার্ড করার তদবির করেন। সম্প্রতি খাজুর ইউপি সদস্য আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে, প্রতিটি চার হাজার টাকার বিনিময়ে প্রায় চারশ’ প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দেন যারা আদৌ প্রতিবন্ধী নন। লক্ষ্মণপুর গ্রামের অর্ধশতাধিক প্রতিবন্ধী ভাতাভোগী যারা প্রতিবন্ধী নন, তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওইগ্রামের কথিত নেতা রহমান টাকার বিনিময়ে তাদের প্রতিবন্ধী কার্ড করে দেন।

তবে অভিযুক্ত সকলের সাথে মোবাইলফোনে কথা বললে, তারা কোনরকম অনৈতিক সুবিধা নেয়ার কথা অস্বীকার করেন। তারা ভূয়া কার্ড করে দেননি বলেও দাবি করেন।

জানতে চাইলে, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা অপকটে স্বীকার করেন ভূয়া কার্ডের কথা। তিনি বলেন, “বর্তমানে এই উপজেলায় প্রতিবন্ধী, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা, অনগ্রসর জনগোষ্ঠী প্রভৃতির মোট ৪১ হাজার কার্ডধারী ভাতাভোগী রয়েছে। এরমধ্যে প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর কার্ড রয়েছে ১৯ হাজার। এছাড়া আরো অন্তত ছয় হাজার কার্ড রয়েছে নকল বা ভূয়া, যেগুলো সরকারি অনুমোদন ছাড়াই কম্পিউটার দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।”

ওই কর্মকর্তা বলেন যে, তিনি এই উপজেলায় যোগদানের পর বিষয়গুলো যাচাই বাছাই করে গত অর্থবছরে তিন হাজার ৩৯৩টি ভূয়া প্রতিবন্ধী কার্ড বাতিল করেছেন। তার মতে এখনও ১৯ হাজার বৈধ কার্ডের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই প্রতিবন্ধী নন। এসব আরো যাচাই বাছাই করে বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান।

তিনি স্বীকার করেন যে, সুস্থ্য মানুষের নামে প্রতিবন্ধী কার্ড ইস্যু ও ভূয়া কার্ড তৈরিতে তার অফিসের দুজন কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। এদের একজনকে অন্যত্র বদলী করা হয়েছে, আর একজন অবসর প্রস্তুতি পিএলআর এ রয়েছেন।